বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ডিজিএম (ভারপ্রাপ্ত-নির্মাণ) মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। চাকরি জীবনের বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালে কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন—এমন অভিযোগ তুলে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত তদন্ত আবেদন করা হয়েছে।সম্প্রতি দুদক চেয়ারম্যান বরাবর মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন রফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ডিজিএম (ভারপ্রাপ্ত-নির্মাণ) মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। চাকরি জীবনের বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালে কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন—এমন অভিযোগ তুলে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত তদন্ত আবেদন করা হয়েছে।সম্প্রতি দুদক চেয়ারম্যান বরাবর মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন রফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি।
৪৫ মাসে কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মো. মনিরুজ্জামান ১৯৯৯ সালে বিআরটিসিতে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন। পরে ২০০৩ সালে সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার এবং এরপর ম্যানেজার (কারিগরি) পদে জাতীয়করণ হন। ১৯৯৯ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি বড় কোনো দায়িত্বে ছিলেন না বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।তবে ২০০৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ১৪ মার্চ পর্যন্ত তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানায় ডিজিএম হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময়ে কারখানায় মাসে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা আয় হতো। এর বড় একটি অংশ যন্ত্রাংশ কেনাকাটায় ব্যয় দেখানো হতো। অভিযোগকারীর দাবি, পছন্দের লোকজনের মাধ্যমে যন্ত্রাংশ ক্রয় করে কমিশন নেওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘ সময়ে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম করা হয়েছে।অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়, প্রায় ৪৫ মাসে যন্ত্রাংশ ক্রয় ও অন্যান্য খাতে মোট ৭ কোটি টাকার বেশি আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসা উন্নয়ন খাতেও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ তোলা হয়েছে।তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নারায়ণগঞ্জ ও কল্যাণপুর ডিপোতেও অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ বাস ডিপোর দায়িত্বে ছিলেন মনিরুজ্জামান। ওই সময়ে ডিপোর নীট লাভ প্রায় ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা দেখানো হলেও তার ব্যক্তিগতভাবে বিপুল অর্থ অর্জনের অভিযোগ করা হয়েছে।এরপর ২০১৫ সালের মার্চ থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত কল্যাণপুর বাস ডিপোর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ওই সময়ে ডিপোতে প্রায় ৪ লাখ টাকা নীট লোকসান দেখানো হলেও তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে কোটি কোটি টাকা অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।অভিযোগকারীর দাবি, তৎকালীন বিআরটিসি চেয়ারম্যান তাকে ‘মডেল ম্যানেজার’ হিসেবে তুলে ধরার পর থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।
৯২ কোটি টাকার প্রকল্প ঘিরে কমিশনের অভিযোগ
২০২৩ সালে বিআরটিসি প্রধান কার্যালয়ের ডিজিএম (ওয়ার্কস) হিসেবে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পান মো. মনিরুজ্জামান।অভিযোগে বলা হয়েছে, বিআরটিসির নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৪০ কোটি টাকার ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সরকারি অনুদানে ডিপিপির আওতায় ৫২ কোটি ৯ লাখ ২৫ হাজার টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।অভিযোগকারীর দাবি, দুটি প্রকল্প মিলিয়ে ১০ কোটি টাকার বেশি অবৈধভাবে আয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল এবং এর একটি অংশ বিভিন্ন খাতে ‘মারিং-কাটিং’ হিসেবে ব্যয় হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পগুলোর অভ্যন্তরীণ অডিট যথাযথভাবে করা হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।তবে এসব অর্থনৈতিক অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি বা প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে নেই।
ক্যাশিয়ার কারাগারে, ডিজিএম কেন অভিযোগের বাইরে—প্রশ্ন
কল্যাণপুর ডিপোতে দায়িত্ব পালনকালে ক্যাশিয়ার মো. সাজ্জাদের বিরুদ্ধে ৩৫ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দুদকের মামলা ও সাজা হওয়ার বিষয়টিও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।অভিযোগকারীর প্রশ্ন, ওই ঘটনায় ক্যাশিয়ার সাজ্জাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তৎকালীন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকা যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছিল কি না।এছাড়া জোয়ারসাহারা ডিপোর হিসাব ইনচার্জ মো. আ. কাদেরের আত্মহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করেও মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও নির্মাণ বিভাগে তার আচরণ ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।তবে আত্মহত্যার ঘটনাটির সঙ্গে মনিরুজ্জামানের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনো স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত তথ্য পাওয়া যায়নি।
চেয়ারম্যানের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আব্দুল লতিফ মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তিনি আরও বলেন, করপোরেশনের স্বার্থে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
বিশেষজ্ঞদের তদন্তের দাবি
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের নামে দেওয়া বক্তব্যে বলা হয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অভিযোগ থাকা উদ্বেগজনক। অভ্যন্তরীণ অডিট ও নজরদারির ঘাটতি থাকলে আর্থিক অনিয়মের ঝুঁকি বাড়ে। অভিযোগ সত্য হলে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে।পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব ড. মো. শফিকুল আলমের বক্তব্যেও বিআরটিসির মতো প্রতিষ্ঠানে শক্তিশালী অডিট, আর্থিক স্বচ্ছতা ও কার্যকর নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।অভিযোগ অস্বীকার না করে দুদকের ওপরই আস্থা মনিরুজ্জামানের অভিযোগের বিষয়ে মো. মনিরুজ্জামানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব অভিযোগ দুদকে করা হয়ে থাকলে দুদকই তা তদন্ত করে দেখবে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
সুষ্ঠু তদন্তের দাবি
বিআরটিসির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে না দেখে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা হোক। একই সঙ্গে অতীতে তিনি যেসব ডিপো, কারখানা ও বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেসব সময়ের প্রকল্প, ক্রয়, বিল, টেন্ডার, অডিট রিপোর্ট ও আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।অভিযোগকারীরা মনে করছেন, দুদক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়মুক্ত করার দাবিও জানানো হয়েছে।